বাজারে প্লাস্টিকের দাপট, হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প
আবদুল মান্নান মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি)
আধুনিকতার ছোঁয়া ও সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে টিকে থাকতে পারছে না পরিবেশবান্ধব বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প। একসময় গ্রামীণ হাটবাজারে ওড়া, কুলা, চালুন, ঝুঁড়ির মতো বাঁশের তৈরি উপকরণ ছিল অপরিহার্য। এখন সেই জায়গা দখল করেছে প্লাস্টিক। এতে শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই শিল্প ও এর কারিগররা পড়েছেন দুঃসময়ের মধ্যে।
গতকাল শনিবার মানিকছড়ির হাটবার ঘুরে দেখা যায়, বাজারের একপাশে বাঁশের পণ্য সাজিয়ে বসেছেন কারিগর খোরশেদ আলম ও তার বোন হালেমা খাতুন। খোরশেদ বলেন, ‘প্লাস্টিকের কারণে আমাদের হস্তশিল্প টিকছে না। বাবা আব্দুস ছামাদের কাছ থেকে শিখেছিলাম এই কাজ। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু এখন দুই বেলা খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এ বাজারে এখনো ১৭-১৮ জন কারিগর বাঁশের উপকরণ বিক্রি করেন। তবে খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। হালেমা খাতুন জানান, ‘সপ্তাহে ২০-২২টি চালুন বানাই, বিক্রি হয় সর্বোচ্চ ১৫-১৬টি। দাম ১২০-১৫০ টাকা হলেও খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক আয় দাঁড়ায় মাত্র ৩০০-৩৫০ টাকা। এতে সংসার চলে না।’
ডাইনছড়ির শফিক মিয়া বলেন, ‘আগে বাঁশ-বেতের জিনিসের দারুণ চাহিদা ছিল। এখন প্লাস্টিক সব দখল করে নিয়েছে। শুধু বেড়া বা চাটাইয়ের কিছুটা চাহিদা আছে।’ রাঙ্গাপানির আব্দুল মালেকের অভিজ্ঞতাও একই, ‘সকাল থেকে হাটে বসে আছি, দুপুর নাগাদ কেবল চারটা বেড়া বিক্রি হলো।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁশ ও বেত শিল্প শুধু কারিগরদের জীবিকার উৎস নয়, এটি পরিবেশবান্ধব এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। অথচ এই শিল্প বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বাজারজাতকরণের ঘাটতি।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা কামরুল আলম জানান, ‘একসময় উপজেলায় বাঁশ-বেত শিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ প্রকল্প ছিল। এখন নেই। টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমে বাজার নিশ্চিত করতে হবে, তারপর উৎপাদন বাড়াতে হবে।’
মানিকছড়ির হস্তশিল্পের সঙ্কট আসলে দেশের সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সহজলভ্য ও সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের কারণে ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে, অথচ পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলেছে। এই অবস্থায় সরকারি সহায়তা, রফতানির সুযোগ সৃষ্টি ও সচেতনতা ছাড়া বাঁশ-বেত শিল্প টিকে থাকা কঠিন। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি ঐতিহ্য ও পরিবেশবান্ধব এই শিল্পকে বাঁচাতে পারব, নাকি প্লাস্টিকের দাপটে তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে? সুত্র: নয়া দিগন্ত



আপনার মতামত লিখুন